বছর দুয়েক আগে হুমায়ূন আহমেদের একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপচারিতার একপর্যায়ে তাঁর পরবর্তী ছবির প্রসঙ্গেও বললেন। সে ছবির কাহিনী আবর্তিত হবে এক শতাব্দী আগে হারিয়ে যাওয়া এদেশের পূর্বাঞ্চলীয় এক লোকসঙ্গীতধারাকে কেন্দ্র করে, সাধারণের কাছে যেটা পরিচিত ছিল ঘেটুগান নামে। বর্ষায় সিলেট-হবিগঞ্জ এলাকার হাওড় অঞ্চলের মানুষ তিনমাস পানিবন্দী থাকতো, কাজকর্ম থাকতো না, অবসর কাটাতে তাদের আনন্দ-ফুর্তির মাধ্যম হিসেবে তখন প্রচলিত ছিল ঘেটুগান। দূর-দূরান্ত থেকে ঘেটুর দল গাইতে আসতো লোক ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মিশ্রিত ঘরানার এ গান। পানিবন্দী তিন মাস তাদের থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করতেন অঞ্চলের বিত্তবানরা। ঘেটুগানের একটা বিশেষত্ব ছিল – এতে অল্প বয়েসী কিছু ছোট ছেলে থাকতো যারা মেয়ের বেশে নেচে গেয়ে সবার মনোরঞ্জন করতো। এদেরকে বলা হতো ঘেটুপুত্র। স্রেফ মনোরঞ্জন করাই এই ঘেটুপুত্রদের একমাত্র কাজ ছিল না, ছিল আশ্রয়দাতা বিত্তবান ভূস্বামীদের রাত্রিসঙ্গী হওয়াও।
শুনতে যত অদ্ভূতই হোক না কেন, গত শতাব্দীতেও রক্ষণশীল এ অঞ্চলে বহুদিন টিকে ছিল এমন একটা বীভৎস সংষ্কৃতি। ঘেটুপুত্রদেরকে ভূস্বামীদের স্ত্রীরা বিবেচনা করতেন তাদের সতীন হিসেবে। স্বামীরা রাতে শুতে যেতেন ঘেটুপুত্রদেরকে সঙ্গে করে, আর আড়ালে চোখের জল ফেলতেন তাদের স্ত্রীরা। এমনই একটা কাহিনীকে উপজীব্য করে হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করেছেন ‘ঘেটুপুত্র কমলা‘ ছবিটি। ছবিটি নিয়ে যে ব্যাপক বিতর্ক হবে, উক্ত সাক্ষাৎকারে সে সম্ভাবনাও নাকচ করেন নি তিনি। আরো বলেছিলেন, এটিই হবে তাঁর সর্বশেষ ছবি। এটা যে স্রেফ তাঁর সিদ্ধান্ত নয়, বরং আশঙ্কা থেকেও বলে থাকতে পারেন, সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি যারা ইতোমধ্যে দেখেছেন, তাদের জন্য আজ সেটা অনুমান করা খুব একটা কঠিন হবার কথা না।
ব্লগে যাওয়া হয় না অনেকদিন, তবে বেশ ক’দিন ধরেই এটার পক্ষে-বিপক্ষে যে তুমুল বিতর্ক-সমালোচনা হচ্ছে, ফেবুতে বসেই সেটা অনুমান করা যায় বন্ধুদের শেয়ার করা লিঙ্ক দেখে। ঠিক করেছিলাম নিজে আগে না দেখে ছবিটার কোন রিভিউ-সমালোচনা পড়বো না। আজ দেখে খায়েস পূর্ণ করলাম। ৯/১১ এর ১১ বছর পূর্তিতে বিশ্বজুড়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছে, তখন ক্লাসের কিছু বন্ধু মিলে দেখে এলাম ছবিটা। এরপর এক বন্ধুর অনুরোধে ভাবলাম নিজেই লিখে ফেলি এটা নিয়ে কিছু একটা। পরবর্তী অংশে যাবার আগে পাঠককে বলে রাখি, এটা মোটেই ছবির রিভিউ নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং ছবিটা দেখে মনে উদিত একান্ত অনুভূতি, অভিমত নিয়ে ভাঙাচোরা অপরিপক্ব লেখনিতে লেখা অত্যন্ত বোরিং একটা দিনলিপি। তাই সিরিয়াস রিভিউ ভেবে পুরোটা পড়ে কেউ তার মূল্যবান সময় অযথা নষ্ট করলে তার দায় কোনক্রমেই লেখকের নয়।

ক’দিন আগে মহানায়ক অনন্তর নতুন ছবি দেখে এলাম। তখন থেকেই ভাবছিলাম ‘ঘেটুপুত্র কমলা’-ও দেখা উচিত সময় করে একদিন। পরীক্ষা শেষ, হাতে অফুরন্ত সময়, কিছুদিন আগেই ছিল ঈদ, সে সুবাদে পকেটও গরম। গেলাম বন্ধুদের সঙ্গে ছবিটা দেখতে। কথা ছিল ১২টার মধ্যে সবাই সিনেপ্লেক্সে পৌঁছবে – অর্গানাইজারের হুকুম। অতিআগ্রহী আমি গিয়ে পৌঁছালাম সাড়ে এগারোটায়। বাকিদের আগমন হলো আরো এক ঘণ্টা পর। এলিভেটরে ওঠার সময় এক সুন্দরীর মুখে শুনলাম ছবিটা দেখে নাকি তার ঘেন্না লেগেছে! এটা শুনে ছবিটা দেখার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। ভুল বুঝবেন না পাঠক, এত ঘেন্নাই যখন লাগছে তার, ছবিটার ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই তাহলে বেশি, কেননা, দৃশ্যপট ভালো করে ফুটিয়ে তুলতে পারলে ঘেটুসংষ্কৃতি মনে ঘেন্না ধরানোর মতোই একটা ব্যাপার। সেক্ষেত্রে পরিচালক নিতান্ত সফল না হলে দর্শকের এমন অনুভূতি হবার কথা নয়। তবু সন্দেহ মন থেকে গেল না পুরোপুরি, কেননা কদিন আগে মহানায়কের দেখা অ্যাকশনধর্মী সিরিয়াস ছবিটা দেখেও আমার ঘেন্না লেগেছিল। যাহোক, সে আবার অন্য প্রসঙ্গ। দু’টি ক্ষেত্রে ঘেন্না লাগার কারণটা যে অভিন্ন হবে না, সে আশায়ই বুক বেধে ঢুকলাম স্টার সিনেপ্লেক্সের তিন নাম্বার থিয়েটারে। ঘণ্টা দুয়েক পর বেরিয়ে বুঝেছিলাম, অমন হাস্যকর বালসুলভ আশঙ্কা করাটা আসলেই বোকামি হয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিমায় ছবিটি নির্মাণ করেছেন। রসিকতার মোড়কেই তিনি শিশুকামের মতো জঘন্য একটা দৃশ্যপট চিত্রিত করেছেন। পেটের দায়ে বাবা নিয়ে এসেছে তার ঘেটুপুত্র ছেলেকে জমিদারের যৌনক্ষুধা মেটাতে আর নির্বিকার সমাজ সেটা মুখ বুজে দেখে যাচ্ছে, এমন একটা দৃশ্যের কথা চিন্তা করা আসলেই কঠিন। এই রূঢ় বাস্তবতাটাকে বিস্মৃতি থেকে বাঁচিয়ে তোলাতেই হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। যৌনতাকে পুঁজি করে ছবি বানাবার একটা অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এটা পুরোপুরি অবান্তর। তিনি মোটেও শিশুকামকে প্রশ্রয় দিয়ে ছবি বানান নি। কিঞ্চিত অপ্রাসঙ্গিক হলেও এ ফাঁকে বলে রাখি, যৌনতাও মানুষের আবেগের অংশ আর আবেগ ছাড়া শিল্প-সাহিত্য সম্ভব না। টাইটানিকে জ্যাক-রোজের ভালোবাসা যেমন আমাদের আবেগকে নাড়া দিয়ে যায়, কামা সুত্রা’র উন্মাতাল যৌনতাও এক্ষেত্রে ঠিক একই কাজ করে, তবে এক্ষেত্রে আবেগটা ভিন্ন। এমনকি শিশুকামী যৌনাবেগজাত অমর সৃষ্টিরও নজির আছে ইতিহাসে। উদাহরণঃ এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের স্রষ্টা লুই ক্যারলের অনেক কাজের প্রেরণা তার শিশুকামিতা। তাছাড়া এ ছবিতে ঘেটুপুত্রকে শিশুকামীদের আবেগের সামগ্রী বানানো হয় নি, বরং, শিশুকামের প্রতি দর্শকের মনে ঘৃণার বীজই উপ্ত হয়েছে এতে। তবে এক্ষেত্রেও নতুন একটা বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে দেখা যায় রাজাকাররাও ভালো মানুষ। এ ছবিতেও দেখেছি শিশুকামী হওয়া সত্ত্বেও জমিদার যথেষ্ট উদার মনের ন্যায় পরায়ণ মানুষ। আমার মতে, এমন হওয়া মোটেও অসম্ভব না। শিশুকামিতা তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি, এটা মানসিক বিকৃতি নাকি যৌনতার প্রকরণ, সে ব্যাপারে নিজের মতামত দেয়াটা এখানে কাজের কথা হবে না। এটা মনোবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত বিষয়, বিজ্ঞানই পারবে এর যথোপযুক্ত উত্তর দিতে। তবে এটুকু বোঝার জন্য খুব বেশি মেধাবী হবার প্রয়োজন নেই যে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিশুকে যৌনকাজে ব্যবহার করা একটা গুরুতর অপরাধ। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Hunger makes a thief of any man’। একইভাবে যৌনক্ষুধাও পারে একটা ভালো মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তুলতে। জমিদারের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এ ব্যাপারটিই ঘটতে দেখেছি। তাছাড়া, যে সমাজের পটভূমিতে এ কাহিনী, তাতে এ ব্যাপারটা অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতো না যে শাস্তির ভয়ে জমিদার ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে বিরত রাখবেন। অন্তত সমাজের সকলের নিরবতা কিংবা একটা দৃশ্যে জমিদারের সহিসেরও একটা ঘেটুপুত্র কেনার বাসনা এমনটাই ইঙ্গিত দেয়। লেখা সমালোচনায় মোড় নিচ্ছে! সুতরাং এখানেই ইতি।
মুভি রিভিউ লেখার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কোনটাই আমার নেই। হুমায়ূন আহমেদের মতো মহান নির্মাতার ছবির সমালোচক হবারও ন্যূনতম স্পর্ধা করছি না। এটাকে ব্যক্তিগত চিন্তা-অনুভূতি সম্বলিত একটা সাদাসিদে ওয়েব লগ হিসেবে মূল্যায়ন করলেই কৃতার্থ হবো। আর হ্যাঁ, কেউ যদি চায় ছবিটার ব্যাপারে এখানে তার মতামত শেয়ার করতে, হি ইজ মোস্ট ওয়েলকাম। ![]()
পুনশ্চঃ এটা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের পাঁচটা ছবি দেখলাম। আগুনের পরশমনি আর শ্যামল ছায়া বাদ দিলে প্রতিটারই বিষয়বস্তু আলাদা। তাই একটার সঙ্গে আরেকটার তুলনা চলে না। তবু কেন যেন মনে হয়েছে এ ছবিটা অনেক বেশি ম্যাচ্যুর। ঘেটুপুত্র চরিত্রে মামুনের অভিনয়ের কথা না বললেই নয়। এতটুকু বয়সে এমন একটা চরিত্রে ওর অভিনয় মুগ্ধ করার মতো। আফসোস! এমন চরিত্রে হলিউডে কেউ অভিনয় করলে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডটা ঠিকই বগলদাবা করে নিত।
ওর জন্য শুভকামনা।
Leave a comment