বুকের ও দু’টোঃ প্রসঙ্গ বিবর্তন

বুকের ও দু’টো কী?

প্রশ্নটা সহজ, তবে উত্তরটা দেবার আগে অবশ্যই দু’দু’ বার করে কিছুটা ভাবনার প্রয়োজন আছে। জবাবে যদি আপনার মনে মানবদেহের বিশেষ কোন অঙ্গের দৃশ্য ভেসে উঠে থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি আলবৎ সঠিক। কংগ্র্যাচুলেশন্‌স! আপনি ডার্টি মাইন্ডের অধিকারী, ঠিক আমার মতন। আর যদি কোন বেরসিক আঁতেলের মতো বলে বসেন, ও দু’টো হচ্ছে Vowel, দুঃখজনক হলেও সত্যি, আপনি এক্ষেত্রেও ভুল নন। বোঝেন নি? তাহলে একটু চিন্তা করে বলুন Book এর ‘o’ দু’টি কী। :P`

যাইহোক, এসব আদিরসাত্মক ধাঁধা আজকের নোটের বিষয় না। আর তাছাড়া পুংটা পুলাপান (যারা আমার টার্গেট পাঠক) এগুলো আগে থেকেই জানে। বিষয়টা আসলে আক্ষরিক অর্থেই বুকের ও দু’টোকে নিয়ে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে, নিপ্‌ল বা স্তনবৃন্ত নিয়ে।

ছেলেদের স্তনবৃন্ত কেন থাকে? – আপনাদের কারো মনে প্রশ্নটি কখনো এসেছে কিনা জানি না, তবে অদ্ভূত এ ব্যাপারটি কিন্তু ভাবিয়েছে অনেককেই, যার থেকে বাদ যাননি অনেক নামজাদা দার্শনিক, বিজ্ঞানীও (তাঁহাদের নাম জানতে চাহিয়া লজ্জা দিবেন না)। ভাবনার কারণ একটিই – নারীদেহের স্তনবৃন্ত যদি বাচ্চাদের দুধ খাওয়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে ছেলেদেরটা কাদের কী কাজে লাগে? বিজ্ঞান কি পারে এর উত্তর দিতে? tl;dr – হ্যাঁ, পারে। বিবর্তনবাদের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেই কেবল এর জবাব মেলে।

আগের লেখায় ডিএনএ, মিউটেশন ইত্যাদি নিয়ে কিঞ্চিত প্যাচাল পেড়েছি, যথারীতি আজকেও থাকছে সেটা। অনেকেরই জেনে থাকার কথা, তবু লেখার স্বার্থে এ ব্যাপারে আরেক দফা প্যাচাল পেড়ে নিই।

ডিএনএ হচ্ছে জীবকোষের অভ্যন্তরে থাকা একটা পদার্থ – ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিইইক এসিড। শুনতে যতই নিরীহ লাগুক না কেন, সর্পিলাকার এই এসিড অনুর মধ্যেই আছে সব জীবের জীবনরহস্য। এই এসিডের অনুতে সাংকেতিকরূপে, অর্থাৎ, কোড আকারে লেখা আছে একেকটা সম্পূর্ণ জীব তৈরির রেসিপি। কোথায় হাত হবে, কোথায় পা, কোথায় মুখ কিংবা আপনার চুল বাবার মতো কোঁকড়া হবে নাকি নাক হবে মায়ের মতো লম্বা, গায়ের রং, উচ্চতা মোটকথা প্রত্যেকটা শারীরিক বৈশিষ্ট্য ঠিক করা থাকে এই রেসিপির বিভিন্ন ইন্সট্রাকশনে, যেগুলোকে বলা হয় ‘জিন’। মানুষ তো আছেই, সাপ-ব্যাং, কেঁচো-তেলাপোকা বা গরু-ছাগল থেকে শুরু করে এমনকি গাছপালার গঠন পর্যন্ত ঠিক করা থাকে ওদের স্ব স্ব ডিএনএ’র মধ্যে।

একেক প্রজাতির ডিএনএ-তে এই রেসিপি আবার একেকরকম, তাই এক প্রজাতির জীব শারীরিক-মানসিক গঠনে অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা। আবার একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্য এমনকি আপন ভাই-বোনের মধ্যেও ডিএনএ’র গঠনে অমিল থাকে (ব্যতিক্রমঃ আইডেন্টিক্যাল টুইন, পার্থেনোজেনেটিক জীব ইত্যাদি)।

পুরো রেসিপিটা আবার অনেকগুলো চ্যাপ্টারে ভাগ করা থাকে যেগুলো থাকে জীবকোষের একেকটা ক্রোমোসোমে। মানুষের এরকম ২৩ জোড়া ক্রোমোসোম আছে, যার ২২টি ঠিক করে দেয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের দেহের গঠন কেমন হবে। অন্য জোড়াটা নির্ধারণ করে জীবটি ছেলে (XY) হবে না মেয়ে (XX), অর্থাৎ, নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক পার্থক্যগুলোর নির্দেশনা থাকে এ ক্রোমোসোম জোড়ায়। বাবা-মা থেকে বাচ্চা জন্মানোর সময় এই জোড়গুলো ভেঙে দু’ভাগ হয়ে বাবা ও মা থেকে অর্ধেকখানা করে গিয়ে যুক্ত হয়ে তৈরি করে সন্তানের রেসিপি। এভাবে সন্তানের রেসিপিতে কিছু ইন্সট্রাকশন যায় বাবার কাছ থেকে, আর কিছু যায় মায়ের থেকে। যার ফলে সন্তানের মধ্যে বাবা-মা দু’জনেরই বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। লিঙ্গ নির্ধারিত হয় জীবটি বাবার থেকে X ও Y এর মধ্যে কোন ক্রোমোজোমটি পাচ্ছে সেটার উপর।

 Image

ডিএনএ’র গঠন। অ্যাডেনিন, থাইমিন, সাইটোসিন ও গুয়ানিন – এই চারটি বর্ণ দিয়েই লেখা জীবনের প্রস্তুতপ্রণালী।

এবার আসি বিবর্তনে। গত পর্বে মিউটেশন, জিন ডুপ্লিকেশন ইত্যাদি ব্যাপারে যা লিখেছিলাম, সেগুলো আরেকবার স্মর্তব্য। বিবর্তন কাজ করে সাধারণত আগের বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর। মানে, আগে যা ছিলো, সেগুলোই প্রজন্মান্তরে পরিবর্তিত হয়। যেমন ধরুন, মাছদের ফিন থেকে এসেছে আজকের ডাঙার জীবদের পা, অন্যদিকে স্থলবাসী কিছু বিদ্রোহী চারপেয়ে উল্টো পথে হেঁটে বিবর্তিত হয়েছে আজকের তিমি-ডলফিনে। একইভাবে আগে ডায়নোসরদের চার পা ছিলো, প্রজন্মান্তরে বদলে সামনের দুইটা পা হয়ে গেলো ডানা, যেটাতে ভর দিয়ে আজকের পাখিগুলো ওড়ে। প্রায় একইরকম বিবর্তন হয়েছে বাদুরদের বেলায়ও। এমনকি কিছু কাঠবিড়ালি, লেমুরও আছে এধরণের উড়ুক্কু ম্যামালদের তালিকায়, যদিও ওদের হাত পুরোপুরি ডানার রূপ নেয় নি, মাঝপথে এসে পৌঁঁছেছে কেবল। তো, এই পরিবর্তনটা হয় জেনেটিক্যালি, অর্থাৎ, ওই রেসিপির ইন্সট্রাকশনে, যে ব্যাপারটাকে লোকে গালভরে “ডিসেন্ট উইথ মডিফিকেশন” বলেও ডাকে – ডারউইন দাদুর দেয়া নাম।

মডিফিকেশনটা পরিচালনা করে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ নামের একটা প্রক্রিয়া। সহজ করে বললে, নিষ্ঠুর প্রকৃতির সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত করে যে অধিক হারে সন্তান-সন্ততি রেখে যেতে পারবে, তার ডিএনএ তে থাকা জিনগুলোই পরবর্তী প্রজন্মে বেশি করে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে জীবনসংগ্রামে সফল ঐ জিনগুলো যে বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী, সেগুলোই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চারিত হতে থাকবে। অন্যদিকে যারা প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে পারবে না, ওরা হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে। এই প্রক্রিয়ায় মিউটেশনের ফলে আগের সফল জিনগুলোও পরিবর্তিত হতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে জিনটা যদি আগের চেয়ে আরো ভালোভাবে জীবটিকে টিকে থাকতে সহায়তা দেয়, তাহলে প্রজন্মান্তরে এই নতুন জিনটি আবার আগেরটিকে রিপ্লেস করে দেবে। এ পুরো প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রতিনিয়ত চলতে থাকে। সংক্ষেপে এটাই বিবর্তন।

পাঠক হয়ত একটা বাপার এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে, পুরো প্রক্রিয়াটিই ঘটে প্রাকৃতিক উপায়ে, এখানে কারো নজরদারি, হস্তক্ষেপ নেই। জল যেমন যেদিকে ঢালু সেদিকে গড়ায়, জীবের বিবর্তনও হয় সেই উপায়ে, ভবিষ্যৎ এখানে পুরোপুরি অন্ধকার। আজকে আপনার তেরশো সিসি’র মগজটা নিয়ে হয়ত অনেক গর্ব করছেন, এমনও হতে পারে, আজ থেকে কোটি বছর পরের পরিবেশে টিকতে এটা আর কোন কাজে আসছে না (অবশ্য ততদিন যদি আমরা টিকে থাকি)। আবার এমনও হতে পারে, মেয়ে কালো হয়েছে বলে মুখ ভার করে আছেন, অথচ একটা সময় গিয়ে দেখা যাবে এই কালোরাই কেবল তখনকার পরিবর্তিত প্রকৃতিতে টিকতে পারছে। মিউটেশনও ঘটে র‍্যান্ডমলি, ওর সাধ্য নেই বোঝার কখন কার কী প্রয়োজন। আগেই বলেছি, মিউটেশনের সঙ্গে উদ্ভব হয় নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের। যেটা প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে বাড়তি উপযোগিতা দেয়, সেটাই বিকশিত হয়। এভাবে বিবর্তনের কোন এক পর্যায়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রয়োজন পড়েছিলো মায়ের দুধ পানের। তখন বিদ্যমান সিবেইশাস গ্ল্যান্ডের (sebaceous gland) যে ছোট্ট পরিবর্তনগুলো দুগ্ধগ্রন্থি (mammary gland) তৈরির দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলো, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ওগুলোই বিকশিত হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় একসময় বাড়তি উপযোগিতা হয়ে আসে বৃন্ত। কিন্তু, হায়! অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচন বোঝে নি এটা কেবল মেয়েদেরই দরকার, ছেলেদের নয়! সামনে যাকে পেয়েছে, তাকে নিয়েই সে মেতে উঠেছে মডিফিকেশনের খেলায়।

আরো একবার ফিরে যাই ডিএনএ-তে। আমাদের চোখ, কান, হাত, পা এগুলো সবই মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় নির্দিষ্ট ক্রমে প্রস্ফুটিত হতে থাকে জেনেটিক রেসিপি অনুসরণ করে। একেকটা জিনের এক্সপ্রেশন হয় একেক সময়ে, সে সঙ্গে বিকশিত হয় তদসংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রেসিপি অনুসরণ করে একটা আস্ত মানুষে রূপান্তরের সময় একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছেলে-মেয়েকে আলাদা করা যায় না। বলতে গেলে সবাই মেয়ে-ই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না টেস্টোস্টেরোন হরমোন নিঃসরণের ফলে ‘মেয়েটি’ ছেলে হয়ে ওঠে। এই হরমোন নিঃসরণের ইন্সট্রাকশনটাই থাকে পুরুষের Y ক্রোমোসোমে। বিবর্তনের যে পর্যায়ে গিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের ডিএনএ-তে স্তনবৃন্ত তৈরির ইন্সট্রাকশন যুক্ত হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা আমাদের শারীরিক গঠন নির্ধারণকারী ওই ২২ জোড়া ক্রোমোসোমের মধ্যে গিয়ে পড়ে, যার কারণেই আজ  ছেলেমেয়ে সবারই স্তনবৃন্ত থাকে। অবাক হবেন জেনে যে কেবল নিপ্‌লই নয়, স্তনগ্রন্থির ক্ষেত্রেও প্রকৃতি একই ভুল করেছে, পুরুষের দেহে হরমোন প্রয়োগে যেটাতে দুধও উৎপন্ন হতে পারে! গ্যালাকটোরিয়া নামে একটা বিশেষ কন্ডিশন আছে যেটাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ছেলেদের বুকে দুধ তৈরি হয়। সদ্যজাত শিশুদের বুকে দুধ হওয়ার ঘটনাও খুব কমন, এমনকি জন্মের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ধরে এটা চলতে পারে। মায়ের শরীরে তৈরি হরমোন রক্তের মধ্য দিয়ে শিশুর শরীরে যায় বলে এমনটা হয়।

ছেলেদের স্তনবৃন্ত কেবল মানুষেই সীমাবদ্ধ নয়, বহু স্তন্যপায়ী জীবের পুরুষদেরই এটা আছে এবং সেটা ঐ উক্ত কারণেই। এমনকি মালয়েশিয়ায় ডায়াক (Dyacopterus spadiceus) নামের এক ধরনের বাদুর আছে যাদের পুরুষদের বুকেও নিয়মিত দুধ তৈরি হয়। একই স্তন্যপায়ী পূর্বপুরুষ থেকে আমরা স্তন্যপায়ীরা সবাই বিবর্তিত হয়েছি বলেই এমনটা হয়। আর আমরা যে কোন বুদ্ধিমান অতিপ্রাকৃত ডিজাইনারের সযত্ন তত্ত্বাবধানে তৈরি হই নি, তার জন্য জীবদেহের এরকম ভুলে ভরা বাজে ডিজাইনের চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ আর কী লাগে?

2 responses to “বুকের ও দু’টোঃ প্রসঙ্গ বিবর্তন”

  1. […] পায় মায়ের থেকে। এসব নিয়ে আগে কিছু ছাইপাঁশ লিখেছিলাম, পড়ে দেখতে […]

  2. […] দুধ তৈরি হতে পারে। এ নিয়ে আগের একটা লেখায় কিঞ্চিত আলোকপাত […]

Leave a comment