ভাইরাসের ফসিল

ড্যান ব্রাউনের ইনফার্নো যারা পড়েছেন, তারা হয়ত জানেন রেট্রোভাইরাসের কথা। রেট্রোভাইরাস এমন একধরণের ভাইরাস যারা ওদের জিনোমের কপি আক্রান্ত প্রাণীর ডিএনএ’র ভেতর ঢুকিয়ে দিতে পারে। এ ভাইরাসের সংক্রমণ যদি শুক্রানু বা ডিম্বানুতে হয়ে থাকে, তাহলে বংশ পরম্পরায় ভাইরাসের এ জিনোম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে। আমাদের অতি সুপরিচিত HIV-ও এরকম একটা রেট্রোভাইরাস।

প্রাকৃতিকভাবেই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এদের সংক্রমণের শিকার হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা। মানুষের জিনোমে এমন হাজার হাজার ভাইরাস রয়ে গেছে। এরা কেউই এখন আর ক্ষতিকর নয়, কেননা মিউটেশনের কারণে এরা অকেজো হয়ে গেছে, ফলে ওদের পক্ষে আর কোন রোগ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এগুলোকে বলা যেতে পারে মৃত ভাইরাসের ফসিল।

এরকম কিছু এন্ডজিনাস রেট্রোভাইরাসের জিনোমের অংশ দেখা যায় মানুষ আর শিম্পাঞ্জির ক্রোমোসোমে। একই ভাইরাস, ক্রোমোসোমের একদম এক জায়গায়। দেখে মনে হবে যেন দু’টি ভাইরাস প্ল্যান করে ঠিক করেছে ওরা মানুষ আর শিম্পাঞ্জির দুই বান্দার জননকোষের একই ক্রোমোসোমে গিয়ে ডিএনএ’র একেবারে একই জায়গায় ওদের জিনোম প্রবিষ্ট করবে।

কেন প্ল্যান করে ঠিক করার কথা বলছি? কারণ দু’টি ভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ-এর একদম এক জায়গায় দুইটা আলাদা ভাইরাস গিয়ে সংক্রমণ করবে — কাকতালীয়ভাবেও এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কম। আমাদের ডিএনএ-তে নিওক্লিওটাইড বেইস পেয়ার আছে তিনশ কোটি। তার মধ্যে লক্ষ লক্ষ জায়গা রয়েছে যেখানে এ ধরণের ভাইরাস তার জিন প্রবেশ করাতে পারে। মানুষ আর শিম্পাঞ্জির ডিএনএ-তে কেবল ERV-W গ্রুপের দুইশ’রও বেশি ভাইরাস রয়েছে কমন। সম্ভাব্যতার বিচারে দুইটি ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর ডিএনএ-তে একদম একই জায়গায় এতগুলো ভাইরাসের গিয়ে সংক্রমণ করার সম্ভাবনা কার্যত শূণ্য।

এর সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে সাধারণ পূর্বপুরুষ — অর্থাৎ, মানুষ আর শিম্পাঞ্জির পূর্বপুরুষ কোন একসময় একই ছিল যারা এরকম অসংখ্য এন্ডজিনাস রেট্রোভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবর্তনের ধারায় দুটি প্রজাতি আলাদা হয়ে অনেক শাখা-প্রশাখা তৈরি করলেও ভাইরাসগুলোর অস্তিত্ব রয়ে গেছে আমাদের জিনোমে।

বিভিন্ন প্রাইমেটের ক্রোমোসোমের একই জায়গায় HERV-K ভাইরাসের প্রবেশ দেখা যাচ্ছে এই ছবিতে (কৃতজ্ঞতাঃ টক অরিজিন্‌স)। একদম বামের ভাইরাসটি সবার মধ্যেই উপস্থিত। প্রজাতি আলাদা হবার আগে যে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়, প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যাবার পর সেটা দুই প্রজাতিতেই পাওয়া যায়। একইভাবে একদম শেষে গিয়ে মানুষের লিনিয়েজে যে ভাইরাসের প্রবেশ ঘটে, সেটা কেবল মানুষেই পাওয়া যায়, অন্যদের মাঝে ওগুলো অনুপস্থিত।

কেন এসব নিয়ে বলছি? কারণ সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে বিবর্তন তত্ত্বের অন্তর্ভুক্তি এবং একে ঘিরে একদল মৌলবাদী মানুষের হাউকাউ। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত থেকে উনিভার্সিটি পাশ অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন। ব্যাপারটা কেবল হতাশাজনকই না, আশঙ্কাজনক।

বিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত দুইটি তত্ত্বের একটি হচ্ছে প্রাণের বিবর্তন। অথচ নিরক্ষর বকলম থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী লোক — একটা দেশের প্রায় সবাই এই ব্যাপারে পুরোপুরি অজ্ঞ। মুষ্টিমেয় যে কয়জনকে পাওয়া যাবে এ বিষয়ে জ্ঞান রাখে, তারাও এটা শিখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে জীববিজ্ঞান পড়তে গিয়ে, নয়ত পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিজ্ঞানের বই পড়ে। বই পড়ার চর্চা আমাদের দেশে কোন কালে ছিল না বললেই চলে, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া বা গেইমে আশক্ত বর্তমান প্রজন্মের কথা আর না-ই বা বলি। প্রাণ সৃষ্টির পর এই বিশাল জীবজগৎ কীভাবে আবির্ভূত হলো, প্রত্যেকটা মানুষের সেটা জানা থাকা জরুরি, অন্তত এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে টিকে থাকার প্রয়োজনে হলেও। আর এজন্য পাঠ্যবইয়ে এর অন্তর্ভুক্তির কোন বিকল্প নেই।

মিথ্যে বলবো না, এক দঙ্গল মূর্খ কুপমণ্ডুক মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে গিয়ে কখনও কখনও দম বন্ধ হয়ে আসে। এ কারণেই মাঝেমাঝে এসব ছাইপাশ লিখে ফেলা, ভীষণ হালকা লাগে। 😅


তথ্যসূত্রঃ Jerry A. Coyne, Why Evolution is True